১.
ভূমিকা
বাংলাদেশ
একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। এ দেশের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী হলেও
হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্মের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান
পালন করেন। বাংলাদেশের সংবিধানেও ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে।
হিন্দুধর্মাবলম্বীদের
বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব, বিশেষত দুর্গাপূজা, কালীপূজা, সরস্বতীপূজা ও অন্যান্য পূজা উপলক্ষে বিভিন্ন দেব-দেবীর প্রতিমা নির্মাণ করা
হয়। ধর্মীয় আচার অনুযায়ী অনেক প্রতিমা পূজা শেষে নদী,
পুকুর,
খাল কিংবা
অন্যান্য জলাশয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়।
এখানে
পরিবেশগত উদ্বেগের প্রধান বিষয় ধর্মীয় বিশ্বাস নয়; বরং প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত
ক্ষতিকর উপকরণ, রাসায়নিক রং, প্লাস্টিক, কৃত্রিম সাজসজ্জা এবং সেগুলো জলাশয়ে ফেলার ফলে সৃষ্ট দূষণ।
ইসলাম
পরিবেশ সংরক্ষণ, পানির পবিত্রতা রক্ষা, অপচয় রোধ এবং জীবজগতের ক্ষতি না করার বিষয়ে
গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে।
এই
আলোচনায় কোরআন-হাদিসের আলোকে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
প্রতিমা বিসর্জনের সম্ভাব্য পরিবেশগত প্রভাব বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরা হলো।
২.
পরিবেশ সংরক্ষণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের নির্দেশনা
ক. স্থল
ও জলভাগে বিপর্যয় সৃষ্টি সম্পর্কে সতর্কবাণী
আল্লাহ
তাআলা বলেন:
ظَهَرَ الْفَسَادُ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا كَسَبَتْ أَيْدِي النَّاسِ
অর্থ:
"মানুষের কৃতকর্মের কারণে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে।"
— সূরা আর-রূম,
আয়াত ৪১।
ব্যাখ্যা:
এই আয়াতে
মানুষের কর্মকাণ্ডের ফলে পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান
পরিবেশবিজ্ঞানের আলোকে পানিদূষণ, বায়ুদূষণ, বন উজাড় এবং জলজ প্রাণীর আবাসস্থল
ধ্বংসের মতো সমস্যাগুলো মানুষের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।
নদীতে
ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ, প্লাস্টিক বা অন্য দূষণকারী বস্তু ফেলার বিষয়টিও এই আয়াতের সাধারণ শিক্ষার
আলোকে বিবেচনা করা যায়।
তবে
আয়াতটি সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসব বা প্রতিমা বিসর্জন সম্পর্কে অবতীর্ণ
হয়নি।
খ.
পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি নিষিদ্ধ
আল্লাহ
বলেন:
وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا
অর্থ:
"পৃথিবীতে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তোমরা তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করো
না।"
— সূরা আল-আরাফ,
আয়াত ৫৬।
এই আয়াত
থেকে পরিবেশ সংরক্ষণের একটি সাধারণ নৈতিক শিক্ষা পাওয়া যায়।
মানুষের
উচিত এমন কর্মকাণ্ড এড়িয়ে চলা, যা নদী, জলাশয়, মাটি, গাছপালা কিংবা প্রাণিকুলের ক্ষতি করে।
গ. পানি
জীবনের অপরিহার্য উপাদান
আল্লাহ
বলেন:
وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ
অর্থ:
"আমি পানি থেকে প্রত্যেক জীবন্ত বস্তু সৃষ্টি করেছি।"
— সূরা আল-আম্বিয়া,
আয়াত ৩০।
পানি
মানুষ, প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।
বাংলাদেশের
নদী, খাল, বিল ও পুকুরগুলো শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়; এগুলো মানুষের জীবন-জীবিকা,
কৃষি,
মৎস্যসম্পদ এবং
জীববৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সুতরাং
এসব পানির উৎস দূষণমুক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
ঘ. অপচয়
সম্পর্কে সতর্কতা
আল্লাহ
বলেন:
وَلَا تُسْرِفُوا إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
অর্থ:
"তোমরা অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।"
— সূরা আল-আরাফ,
আয়াত ৩১।
উৎসবসহ
যেকোনো উপলক্ষে অপ্রয়োজনীয় প্লাস্টিক, রাসায়নিক সামগ্রী ও একবার ব্যবহারযোগ্য
উপকরণের ব্যবহার কমানোর ক্ষেত্রে এই নির্দেশনার শিক্ষা প্রাসঙ্গিক।
৩.
পরিবেশ রক্ষায় হাদিসের নির্দেশনা
ক. ক্ষতি
করা বা ক্ষতির প্রতিশোধে ক্ষতি করা নিষিদ্ধ
রাসুলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন:
لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ
অর্থ:
"নিজে ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির প্রতিশোধেও ক্ষতি করা যাবে না।"
— সুনানে ইবনে মাজাহ,
হাদিস ২৩৪০।
এই হাদিস
ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ভিত্তি।
মানুষের
স্বাস্থ্য, সম্পদ ও পরিবেশের ক্ষতি হয়—এমন কাজ প্রতিরোধের
ক্ষেত্রে এই নীতি প্রাসঙ্গিক।
খ. পানির
উৎস দূষিত না করার নির্দেশনা
রাসুলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন:
"তোমাদের কেউ যেন স্থির পানিতে প্রস্রাব না করে, যা প্রবাহিত হয় না;
তারপর তাতে গোসল
করে।"
— সহিহ বুখারি,
হাদিস ২৩৯;
সহিহ মুসলিম,
হাদিস ২৮২।
শিক্ষা:
এই
হাদিসে স্থির পানির পরিচ্ছন্নতা রক্ষার একটি নির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
এর
সাধারণ শিক্ষা অনুযায়ী পানির উৎসে ক্ষতিকর বর্জ্য ফেলা থেকে বিরত থাকা উচিত।
গ. পথ
থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ
রাসুলুল্লাহ
(সা.) বলেছেন:
"রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া সদকা।"
— সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে
বর্ণিত।
এই হাদিস
জনসাধারণের চলাচলের স্থান পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে।
একই
নৈতিক শিক্ষা থেকে নদীর তীর, ঘাট ও জনসমাগমস্থল পরিচ্ছন্ন রাখার
প্রয়োজনীয়তা বোঝা যায়।
৪.
বাংলাদেশে প্রতিমা তৈরিতে ব্যবহৃত উপকরণ
বাংলাদেশে
প্রচলিত অনেক প্রতিমা তৈরিতে প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম উভয় ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হয়।
সাধারণ
উপকরণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. বাঁশ
ও কাঠ
২. খড় ও পাট
৩. মাটি
৪. বিভিন্ন
ধরনের রং
৫. আঠা
৬. কাপড়
৭. প্লাস্টিক ও
পলিথিন
৮. থার্মোকল বা
ফোম
৯. কৃত্রিম
অলংকার
১০. ধাতব ও
অন্যান্য সাজসজ্জার উপকরণ।
সব
প্রতিমায় এসব উপকরণ ব্যবহার করা হয় না। বিশেষ করে পরিবেশবান্ধব মাটি ও প্রাকৃতিক
রং দিয়ে তৈরি প্রতিমার পরিবেশগত প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
অন্যদিকে,
ব্যবহৃত রং বা
সাজসজ্জার উপকরণে ক্ষতিকর রাসায়নিক থাকলে পরিবেশের ঝুঁকি বাড়ে।

0 Comments